"সাপকে মারবেন না" — এই কথা বলার মুহূর্তেই খরিসের ছোবলে ঝরে গেল সর্পপ্রেমীর প্রাণজঙ্গলমহলের একটি গ্রামের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক পরিচিত এবং ভরসার নাম। বাড়িতে সাপ ঢুকেছে শুনলেই ছুটে যেতেন, বিষধর সাপকে নিজের হাতে ধরে ন…
"সাপকে মারবেন না" — এই কথা বলার মুহূর্তেই খরিসের ছোবলে ঝরে গেল সর্পপ্রেমীর প্রাণ
জঙ্গলমহলের একটি গ্রামের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক পরিচিত এবং ভরসার নাম। বাড়িতে সাপ ঢুকেছে শুনলেই ছুটে যেতেন, বিষধর সাপকে নিজের হাতে ধরে নিরাপদে জঙ্গলে ছেড়ে আসতেন। প্রতিবারই মানুষকে বোঝাতেন, "সাপকে মারবেন না, সাপ আমাদের পরিবেশের বন্ধু।" সোমবার সন্ধ্যায় ঠিক সেই কথাগুলো বলতে বলতেই তাঁর জীবনে নেমে এল অন্ধকার। পশ্চিম মেদিনীপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা এখন গোটা এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে।
কে ছিলেন তিনি?
৫৪ বছর বয়সী তপন কুমার সিংহের পেশা ছিল গাড়ি চালানো, কিন্তু তাঁর আসল নেশা ছিল সাপ উদ্ধার। মেদিনীপুর সদর ব্লকের ধেড়ুয়া এলাকার বাসিন্দা তপনবাবু কোথাও সাপ বেরিয়েছে শুনলেই নির্ভয়ে ছুটে যেতেন সেখানে। বহু বাড়ি থেকে বিষধর সাপ উদ্ধার করে জঙ্গলে অবমুক্ত করার কাজ তিনি নিয়মিত করতেন, প্রায় বিনা সুরক্ষা সরঞ্জামেই।
সেই সন্ধ্যায় ঠিক কী ঘটেছিল?
সোমবার সন্ধ্যায় মেদিনীপুর সদরের কুকুরমুড়ি এলাকায় একটি বিষধর সাপ ধরার খবর পেয়ে ছুটে যান তপনবাবু। সাপটিকে দক্ষ হাতে ধরে যখন মানুষকে সচেতন করছিলেন যে সাপকে মারা উচিত নয়, ঠিক তখনই তিনি উল্লেখ করেন নদিয়া জেলার এক সর্পপ্রেমীর মৃত্যুর কথা, যিনি সাপ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। কথা বলার সেই মুহূর্তেই সামান্য অসতর্কতায় জারের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসা খরিস সাপটি ছোবল বসিয়ে দেয় তাঁর গায়ে।
আশ্চর্যজনকভাবে, ছোবল খাওয়ার পরেও তিনি সাপটিকে ছেড়ে দেননি। ধৈর্য ধরে সাপটিকে প্লাস্টিকের জারে ভরে বাড়ি ফিরে আসেন। কিন্তু বাড়ির লোকজনকে বিষয়টি জানাতে অনেকটা দেরি করে ফেলেন তিনি, যতক্ষণে শারীরিক অসুবিধা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও বাঁচানো গেল না
পরিস্থিতি খারাপ হতে দেখে দ্রুত তাঁকে মেদিনীপুর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এর কিছুদিন আগেই নদিয়া জেলাতেও একইভাবে এক সর্পবন্ধু সাপ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরপর দুটি একই ধরনের ঘটনা সাপ উদ্ধারের কাজে যুক্ত মানুষদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
দুর্ঘটনার নেপথ্যে কারণ কী?
স্থানীয় অনেকের অনুমান, ফেসবুকের জন্য রিলস তৈরির উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে সাপের দিকে থেকে মুহূর্তের জন্য নজর সরে যাওয়াতেই এই বিপদ ঘটে। এছাড়া সাপ উদ্ধারের সময় তপনবাবু হাতে কোনও গ্লাভস বা সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করতেন না, যা এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বিপদের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে দেয়।
শেষ কথা
তপন কুমার সিংহের মতো মানুষরাই সমাজে সাপের প্রতি ভয় নয়, সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ করে যান নিঃস্বার্থভাবে। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, বরং পরিবেশ ও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের কাজে যুক্ত মানুষদের জন্যও এক বড় শিক্ষা— সাহসিকতার পাশাপাশি সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করাও সমান জরুরি।

কোন মন্তব্য নেই