মেদিনীপুর: একসময় যেখানে শত শত শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত গোটা এলাকা, সেই মেদিনীপুরের বিড়লা সুতো মিলের পরিণতি এবার আরও করুণ। মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন তাঁতিগেড়িয়া এলাকায় অবস্থিত দীর্ঘদিনের বন্ধ বিড়লা মিলটি এবার বাজেয়াপ্ত ক…
মেদিনীপুর: একসময় যেখানে শত শত শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত গোটা এলাকা, সেই মেদিনীপুরের বিড়লা সুতো মিলের পরিণতি এবার আরও করুণ। মেদিনীপুর শহর সংলগ্ন তাঁতিগেড়িয়া এলাকায় অবস্থিত দীর্ঘদিনের বন্ধ বিড়লা মিলটি এবার বাজেয়াপ্ত করল ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্ক।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় নিয়ম মেনেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। প্রায় ২০০ একর জমি সহ মিলের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি কারখানার পাশে থাকা পুরনো কোয়ার্টার থেকেও পাঁচটি কর্মী পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
ঘটনার সময় এলাকায় উপস্থিত ছিল বিপুল পুলিশ বাহিনী। বৃষ্টির মধ্যেই পরিবারের সদস্যদের জিনিসপত্র কোয়ার্টার থেকে বের করে রাস্তায় রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলির মধ্যে।
একসময় কাজ করতেন ৫০০-র বেশি কর্মী
জানা যায়, কারখানাটির কোম্পানির নাম ছিল কেশর মাল্টিয়ার্ন মিল লিমিটেড। একসময় এই সুতো মিলে ভালো উৎপাদন হতো। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা ৫০০-র বেশি কর্মী সেখানে কাজ করতেন। পাশাপাশি স্থানীয় এলাকার কয়েকশো মানুষও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মিলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক সমস্যায় পড়ে সংস্থাটি। উৎপাদন কমতে থাকে এবং ধীরে ধীরে মিলের পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করে।
২০১৪ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয় মিল
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০১১ সালের পর রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে মিলটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। রাজনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে সংস্থার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যদিও এই অভিযোগগুলির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ বা সংস্থার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে মিলটি পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কোম্পানির আধিকারিকরা এলাকা ছেড়ে চলে গেলেও বহু কর্মী তখনও কারখানার পাশের পুরনো কোয়ার্টারে থেকে যান।
বকেয়া টাকা না মেটায় কোয়ার্টার ছাড়েননি কর্মীরা
কর্মী পরিবারগুলির দাবি, দীর্ঘদিন কাজ করার পরও কোম্পানির কাছে তাঁদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বকেয়া টাকা রয়ে গিয়েছিল। সেই টাকা না মেটানো পর্যন্ত তাঁরা কোয়ার্টার ছাড়তে রাজি হননি।
এমনকি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও তাঁরা সেখান থেকে সরে যাননি বলে জানা যায়।
পরিবারগুলির বক্তব্য, তাঁদের সন্তানদের অনেকেই মেদিনীপুরে পড়াশোনা করছিলেন। কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে পড়তেন। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকাকেই নিজেদের বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করে আসছিলেন তাঁরা।
নতুন করে মিল চালুর আশার মধ্যেই বড় ধাক্কা
পরবর্তীতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ কারখানাটি ফের চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি। এমনকি বিষয়টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের কাছেও তুলে ধরা হয়েছিল বলে জানা যায়। মেদিনীপুরের বিধায়ক ডক্টর শংকর গুছাইতও মিলটি পুনরায় চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই ঘটল সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা।
হঠাৎ ব্যাংক আধিকারিকদের অভিযান
বৃহস্পতিবার দুপুরে আচমকাই ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্কের আধিকারিকরা বিশাল পুলিশ বাহিনী নিয়ে মিল চত্বরে পৌঁছন বলে জানা যায়।
বন্ধ কারখানাটির বিভিন্ন অংশ দখলে নেওয়া এবং সম্পত্তি সিল করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর মিলের পাশে থাকা পুরনো কোয়ার্টারগুলিতেও পৌঁছন ব্যাংক কর্তারা।
পরিবারগুলির অভিযোগ, কোনও রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই তাঁদের ঘর থেকে জিনিসপত্র বের করে দেওয়া হয়। পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতিতে পরিবারের সামগ্রী রাস্তায় ফেলে রাখা হয় বলেও অভিযোগ তাঁদের।
“ছেলেমেয়েরা স্কুল থেকে ফিরে কী দেখবে?”
উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলির দাবি, তাঁরা বেআইনিভাবে সেখানে বসবাস করছিলেন না। তাঁদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পাওনা রয়েছে এবং সেই টাকা মিটিয়ে দিলে তাঁরা নিজেরাই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে যেতেন।
এক পরিবারের বক্তব্য, “আমরা কোম্পানির কাছে মোটা টাকা পাব। সেই টাকা মিটিয়ে দিলে আমরা সরে যেতাম। উচ্ছেদের আগে অন্তত একটা নোটিশ দেওয়া দরকার ছিল।”
পরিবারগুলির আরও অভিযোগ, তাঁদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। সন্তানরা স্কুল বা কলেজে যাওয়ার পর ফিরে এসে নিজেদের সমস্ত জিনিসপত্র রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখতে পারেন—এই পরিস্থিতিই তাঁদের সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ করেছে।
ব্যাংকের দাবি কী?
অন্যদিকে, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, প্রায় ১২ বছর আগে কারখানার মালিক প্রায় ৩০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। বারবার জানানো সত্ত্বেও সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়নি বলে দাবি ব্যাংকের।
ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, কারখানার মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় নিয়ম মেনেই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিড়লা মিলের ভবিষ্যৎ কী?
একসময় শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের অন্যতম কেন্দ্র ছিল মেদিনীপুরের এই শিল্প প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মিলটি পুনরায় চালু হবে—এই আশায় ছিলেন স্থানীয় মানুষ এবং প্রাক্তন কর্মীদের একাংশ।
কিন্তু ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর সেই সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
প্রায় ২০০ একর জমি, দীর্ঘদিনের বন্ধ কারখানা এবং পুরনো কর্মী পরিবারগুলির বকেয়া পাওনা—সব মিলিয়ে মেদিনীপুরের বিড়লা মিলের ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশাসন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারের মধ্যে পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ হয়, সেদিকেই নজর থাকবে।
Medinipur News, Medinipur Birla Mill, Birla Mill, মেদিনীপুর খবর, মেদিনীপুরের খবর, বিড়লা মিল, বিড়লা মিল বাজেয়াপ্ত, তাঁতিগেড়িয়া, Indian Overseas Bank, West Bengal News, Bengal News, Industrial News, শ্রমিক পরিবার, কারখানা বাজেয়াপ্ত

কোন মন্তব্য নেই